বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে দেওয়া ১৩ দফা দাবির মধ্যে ৯টি মেনে নেওয়াতে বুধবার রাত থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করেছে ক্রিকেটাররা। ফলে শুক্রবার থেকে জাতীয় দলের ক্যাম্পে আর শনিবার থেকে মাঠে গড়াবে জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ড।

আন্দোলন থামলেও ক্রিকেটারদের মধ্যে এখনো আশঙ্কা রয়ে গেছে তাদের দাবীর বাস্তবায়ন নিয়ে। ক্রিকেটারদের দাবি গুলোর একটি বড় অংশ ছিলো আর্থিক ইস্যু নিয়ে। যেখানে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়ানো, চুক্তিভিত্তিক ক্রিকেটারদের সংখ্যা বাড়ানোসহ একাধিক ইস্যু ছিল। এখন কথা হচ্ছে ক্রিকেটারদের দাবি গুলো মেনে নেওয়ার মতো আর্থিক ভাবে সামর্থ আছে কি বিসিবির।

আয়ের দিক থেকে ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পরেই ক্রিকেট বিশ্বের পঞ্চম ধনী বোর্ড বিসিবি। তা সত্বেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বেতন জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফগানিস্তান, শ্রীলংকার ক্রিকেটারদের চাইতে কম।

তবে বিসিবি কিভাবে বিশ্বের প্রথম পাঁচটি অর্থশালী বোর্ডের মধ্যে জায়গা পেলো সেটি একটি প্রশ্ন। এর পেছনে কি সরকারের কোনো অনুদান আছে। এমনটি যদি আপনি ভেবে থাকেন তাহলে আপনার ধারণা ভুল।

বাংলাদেশে ক্রিকেট বোর্ড একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তাদের সব আয়ের উৎস ক্রিকেট থেকে। বোর্ডের আয়ের একটি বড় অংশ আসে আইসিসির রাজস্ব থেকে। সেখান থেকে বর্তমান চক্রে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাচ্ছে বিসিবি। আর বিভিন্ন টুর্নামেন্টের লাভ থেকে আসে অর্থ।

বিসিবির আয়ের আরেকটি বড় খাত টিভি স্বত্ব। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টিভি স্বত্ব পেয়েছে গাজী টিভি। ছয় বছরে এখান থেকে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি পাবে বোর্ড।

এ ছাড়া ডিজিটাল রাইটস, টিম স্পন্সর, বিভিন্ন টুর্নামেন্টের স্পন্সর, স্টেডিয়ামের ভেতরে দেয়াল, গ্যালারি, সাইটস্ক্রিন, বাউন্ডারি সীমানায় বিজ্ঞাপন থেকে আসে মোটা অঙ্কের অর্থ।

বিগত কয়েক বছরের বিভিন্ন মাধ্যম হতে পাওয়া বিসিবির আর্থিক অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হলোঃ

আইসিসির টেস্ট ফান্ডের আয়ে আট বছর মেয়াদি প্রকল্পে (২০১৬-২০২৩) বিসিবির তহবিলে উপচে পড়বে টাকা। আইসিসির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই আট বছরে টেস্ট ফান্ড তহবিল থেকে বিসিবির তহবিলে যোগ হওয়ার কথা ১২৮ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক হাজার ২৪ কোটি টাকা। এরই মধ্যে টেস্ট ফান্ড থেকে দুই কিস্তিতে বিসিবি পেয়েছে ১২৩ কোটি ৭০ হাজার টাকা।২০১৪ সালে এককভাবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন করার পর ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ২২৯ কোটি ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৫২ টাকা আয় করে রেকর্ড করেছিল। বিপিএল থেকে ৪০ কোটির উপর আয় ধরা হয়ে থাকে বিসিবির।

আইসিসিই এখন বিসিবির আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। বিসিবির অডিট রিপোর্ট বলছে, (২০১০-১১ থেকে ২০১৬-১৭) বিভিন্ন খাত থেকে বিসিবির মোট আয় এক হাজার ৪৫৫ কোটি ১৯ লাখ ১৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আইসিসি ও এসিসির টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ, স্বাগতিক মর্যাদা এবং আইসিসি টেস্ট ফান্ড থেকে বিসিবির তহবিলে যুক্ত হয়েছে ৭১৭ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

আইসিসির দুটি বড় ইভেন্টে স্বাগতিকের মর্যাদা বিসিবির অর্থভাণ্ডারকে করেছে আরো সমৃদ্ধ। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যৌথ স্বাগতিক মর্যাদা এবং ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের একক স্বাগতিক মর্যাদার সুবাদে বিসিবি আয় করেছে ৩১৭ কোটি ১০ লাখ ২৫ হাজার ২২৫ টাকা! ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আট ম্যাচ আয়োজনে আইসিসি থেকে বিসিবি পেয়েছে ১৮৬ কোটি ৩৫ লাখ ৫৩ হাজার ৪৮৩ টাকা! ২০১৫ সালে আইসিসি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে শুধু নতুন ইতিহাসই গড়েনি বাংলাদেশ দল, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্মরণীয় পারফরম্যান্সে বিসিবির অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ৬৫ হাজার ৪২০ টাকা! সর্বশেষ বিশ্বকাপেও বিশাল অঙ্কের টাকা আয় করেছে বিসিবি।

এছাড়াি বিভিন্ন ব্যাংক গচ্ছিত ফিক্সড ডিপোজিটের সুদ থেকে ৪৫ কোটি ৫৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয়ের কথা ভাবছে কর্তাব্যক্তিরা। গত অর্থ বছরে এই খাত থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)’র আয় হয়েছিল ৩৫ কোটি টাকা। এতেই অনুমেয় বিভিন্ন ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে। জাতীয় দলের বিভিন্ন স্পন্সর থেকে আয় সেখানে ৪০ কোটির উপর!

বিভিন্ন অর্থবছরে বিসিবির আয়ঃ

বিসিবি ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০৪ কোটি ৩ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৩৯ কোটি ৪৮ হাজার টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ১২৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০১ কোটি ১ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৫৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৬৫ কোটি ২২ লাখ টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৮১ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২২০ কোটি!

মন্তব্য: