22.6 C
New York
Tuesday, July 28, 2026

Buy now

টুথপেস্ট নয়, ঘরের আরও যেসব জিনিসে লুকিয়ে আছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টুথপেস্টই মাইক্রোপ্লাস্টিকের একমাত্র উৎস নয়। আপনি যে ঘরে থাকেন, প্রতিদিন যে কাপড় পরেন, যে রান্নাঘরে খাবার তৈরি করেন সেখানেও নীরবে ছড়িয়ে আছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলছে, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকেই মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। কিছু মাইক্রোপ্লাস্টিক ইচ্ছাকৃতভাবে প্রসাধনী বা শিল্পপণ্যে ব্যবহার করা হলেও, বেশিরভাগই তৈরি হয় বড় প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। এগুলো বাতাস, পানি, খাদ্য এমনকি মানুষের শরীরেও পৌঁছে যাচ্ছে। বাথরুম থেকে রান্নাঘর, পোশাক থেকে ধুলাবালি-অজান্তেই প্রতিদিন প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছেন আপনি।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্ল্যাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কের নমুনাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো চলছে।

ঘরের ধুলাবালিই সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি

প্রতিদিন ঝাড়ু দেওয়া বা ধুলা মোছার সময় হয়তো ভাবেন না, সেই ধুলার মধ্যেই থাকতে পারে অসংখ্য প্লাস্টিক কণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের আসবাব, সিনথেটিক কাপড়, কার্পেট, পর্দা ও বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। পরে সেগুলো ঘরের ধুলার সঙ্গে মিশে বাতাসে ভাসতে থাকে।

ইউএনডিপির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাড়ির ভেতরের ধুলায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এখন বিশ্বজুড়েই উদ্বেগের বিষয়। শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ তারা মেঝেতে বেশি সময় কাটায় এবং বারবার হাত মুখে দেয়।

পোশাক থেকেই ছড়াচ্ছে লাখো প্লাস্টিক ফাইবার

আজকাল ব্যবহৃত অধিকাংশ পোশাকেই রয়েছে পলিয়েস্টার, নাইলন বা অ্যাক্রিলিকের মতো সিনথেটিক তন্তু। এসব কাপড় ধোয়ার সময় হাজার হাজার মাইক্রোফাইবার পানিতে মিশে যায়। শুধু তাই নয়, কাপড় পরার সময়ও অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক তন্তু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) তথ্যমতে, বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের বিষয়টি এখন স্বাস্থ্য গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

রান্নাঘরের প্লাস্টিকও হতে পারে নীরব ঝুঁকি

প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড, খুন্তি, স্প্যাচুলা কিংবা খাবার রাখার বক্স সবই দীর্ঘদিন ব্যবহারে ক্ষয় হতে থাকে। বিশেষ করে গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা বা মাইক্রোওয়েভে গরম করলে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ও কিছু রাসায়নিক খাদ্যে চলে আসার আশঙ্কা বাড়ে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা কাচ, স্টেইনলেস স্টিল কিংবা কাঠের বিকল্প ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

টি-ব্যাগ ও ডিসপোজেবল কাপেও লুকিয়ে থাকতে পারে প্লাস্টিক

অনেকেই মনে করেন কাগজের কাপ বা টি-ব্যাগ সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। বাস্তবে অনেক পণ্যের ভেতরে পাতলা প্লাস্টিকের আবরণ থাকে, যা গরম পানির সংস্পর্শে ক্ষুদ্র কণা ছাড়তে পারে। তাই সম্ভব হলে ঢিলা চা-পাতা বা প্লাস্টিকবিহীন টি-ব্যাগ ব্যবহার করাই ভালো।

প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী

শুধু টুথপেস্ট নয়, কিছু ফেস স্ক্রাব, গ্লিটারযুক্ত প্রসাধনী এবং ক্লিনিং পণ্যেও বিভিন্ন ধরনের সিনথেটিক পলিমার ব্যবহার করা হয়। অনেক দেশে মাইক্রোবিড নিষিদ্ধ হলেও, সব ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তাই কেনার আগে উপাদান তালিকা দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

যেসব জিনিসে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি

ঘরের ধুলাবালি
সিনথেটিক কাপড় (পলিয়েস্টার, নাইলন, অ্যাক্রিলিক)
প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড
প্লাস্টিকের খাবারের পাত্র
টি-ব্যাগ ও ডিসপোজেবল কফি কাপ
কিছু প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য

স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কী বলছে গবেষণা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে ঠিক কতটা ক্ষতি করে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে যেহেতু খাদ্য, পানি ও বাতাস-সব পথেই এসব কণা শরীরে প্রবেশ করছে, তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে ২০২৪ সালে দ্যা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ধমনীতে জমে থাকা প্লাকের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে এসব কণা পাওয়া গেছে, তাদের হৃদ্‌রোগ-সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষকেরা এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, এটি সম্পর্ক দেখিয়েছে, কারণ-প্রমাণ নয়। অর্থাৎ মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি এসব রোগের কারণ-এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময় এখনো আসেনি।

ইউএনইপি-এর ইকোসিস্টেমস ডিভিশনের পরিচালক সুসান গার্ডনারের মতে, ‌মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পৃথিবীর প্রায় সব পরিবেশেই পাওয়া যাচ্ছে। তাই সমস্যার সমাধান করতে হলে উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ কমাতে হবে।

কীভাবে কমাবেন ঝুঁকি?

মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস আপনার এক্সপোজার কমাতে পারে।

গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে না রাখা।
কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও খাবারের পাত্র ব্যবহার করা।
ঘর নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করা।
সম্ভব হলে তুলা, লিনেন বা অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক বেশি ব্যবহার করা।
অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো।
প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের উপাদান তালিকা দেখে কেনা।

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। কারণ এটি শুধু টুথপেস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের ঘর, রান্নাঘর, পোশাক, এমনকি বাতাসেও এর উপস্থিতি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনো এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো মানেই শুধু পরিবেশ নয়, নিজের সুস্থতার দিকেও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউএনইপি, সাইন্স ডিরেক্ট

Related Articles

Leave a reply

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

0FansLike
3,913FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles